• শনিবার ১৯শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম


    করোনা পরবর্তী কৃষি-ই হবে জীবিকার প্রধান চালিকা শক্তি

    ফিচার ডেস্ক | ১৮ মে ২০২১ | ৯:০১ অপরাহ্ণ

    করোনা পরবর্তী কৃষি-ই হবে জীবিকার প্রধান চালিকা শক্তি

    লেখক: কৃষিবিদ মো: রফিকুল ইসলাম, সহকারী ব্যবস্থাপক, পদক্ষেপ, ঢাকা

    করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবজনিত কারণে আমরা বর্তমানে ব্যক্তি, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। শুধু যে আমাদের দেশেই এই ক্রান্তিকাল চলছে তা নয় বরং সারাবিশ্বেই একই অবস্থা বিরাজ করছে। করোনার কারণে আমরা যে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি এবং হচ্ছি তা কাটিয়ে উঠতে হয়ত দীর্ঘ সময় লাগবে। অন্যদিকে করোনা মহামারি যদি আরো দীর্ঘায়িত হয় তাহলে সাবিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা বলার সময় এখনও আসেনি। এহেন পরিস্থিতিতে সংগতকারণেই মানুষের জীবন জীবিকার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে।


    বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এখনো বাংলাদেশের শতকরা প্রায় পঁচাত্তর ভাগ গ্রামীন জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস কৃষি। তাই কৃষির উন্নয়নকে সবার আগে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশের অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাত হচ্ছে কৃষি, শিল্প ও বৈদেশিক রেমিটেন্স। শিল্পের মধ্যে তৈরী পোষাক খাত সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৃষি-ই (শস্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ) হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কৃষি হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

    খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ আশংকা প্রকাশ করছে যে বিশ্বজুড়ে করোনার কারণে যে সংকট তৈরী হবে তার প্রাথমিক ধাক্কা আসবে খাদ্য নিরাপত্তার উপর। আর সে কারণে বিশ্বে বিরাট খাদ্য ঘাটতি-ই শুধু নয়, দেখা দিতে পারে ভয়াবহ দুভিক্ষ। এতে খাদ্যের অভাবে পৃথিবীতে বহু মানুষের মৃত্যুর আশংকা প্রকাশ করা হচ্ছে। তাই আগামীতে যাতে কোন প্রকার খাদ্য ঘাটতি না হয় সেজন্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরী হয়ে পড়েছে।


    করোনাভাইরাসজনিত কারণে বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হবে এবং দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে অন্য কোন বিকল্প নেই।

    কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়সমূহ এবং মন্ত্রনালয়সমূহের অধিদপ্তর/দপ্তর, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, কৃষক, কৃষিবিদগণ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারী সংস্থাসমূহও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে বিশেষ করে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউণ্ডেশন (PKSF) তার সহযোগী সংস্থাসমূহের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি/প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করছে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন ভিত্তিক প্রযুক্তি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যা কৃষি উৎপাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।


    করোনা ভাইরাসের মহামারির প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব এমন কি রাজনৈতিক প্রভাব অদুর ভবিষ্যতে দীর্ঘ মেয়াদী হবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই এই পরিস্থিতিতে কৃষির উৎপাদন অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও স্বল্প মেয়াদী কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সার্বকভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য টেকসই খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ এবং কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে:

    এক. করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং নতুন সৃষ্ট দারিদ্র বিমোচনে আসন্ন অর্থ বছরের বাজেটে কৃষিকে অগ্রাধিকার খাত হিসাবে বিবেচনা করা এবং বাজেটে কৃষিখাতে গত বছরগুলোর তুলনায় বেশী অর্থ বরাদ্দ রাখা। পাশাপাশি সরকারের খাদ্য মজুদ করার সামর্থ বৃদ্ধি এবং অতিদরিদ্র মানুষের জন্য করোনা পরবর্তীতে খাদ্য সহায়তা চালু রাখা।

    দুই. ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।

    তিন. কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে সেচ কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া। সেচ কাজে ব্যবহৃত জ্বালানী তেলের মূল্যও হ্রাস করা। সেচের ভর্তুকির টাকা সেচকল মালিকদের পরিবর্ত উৎপাদনকারী কৃষকদেরকে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে প্রদান করা।

    চার. আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষিকাজে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কৃষকদেরকে উৎসাহিত করা এবং দক্ষ করে তোলা। কৃষি যান্ত্রিকরণে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।

    পাঁচ. উৎপাদন মৌসুমে কৃষি উপকরণ ক্রয়ের জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদেরকে সহজশর্ত ঋণ সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

    ছয়. পর্যাপ্ত দানাদার শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে টেকসই ভ্যালু চেইন প্রতিষ্ঠা করা যাতে উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকে।

    সাত. কৃষি পণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থার উন্নয়নে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিভিন্ন উৎপাদিত কৃষিজাত পণ্য সংরক্ষণের জন্য ফসল ভিত্তিক প্রয়োজনীয় সংখ্যক হিমাগার স্থাপন করা । এক্ষেত্রে বেসরকারী পর্যায়ে অবকাঠামো নির্মান ও প্রশিক্ষণ প্রদানে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা।
    আট. সরকার কর্তৃক প্রদত্ত কৃষি ঋণের সুবিধা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক পর্যায়ে পৌছানোর ক্ষেত্রে কৃষকদের নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরী করা। যেনতেনভাবে কৃষকদের ডাটাবেজ করলে এর সুফল প্রকৃত কৃষকগণ বঞ্চিত হবেন।
    নয়. কৃষি উৎপাদনের প্রধান উপকরণ বীজ উৎপাদনে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়িয়ে বীজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। আমদানী নির্ভর বীজ ব্যবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসা।

    দশ. বেসরকারী পর্যায়ে গুণগতমানের শাক-সবজি ও ফলের চারা উৎপাদনের জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং এক্ষেত্রে তাদেরকে সরকারী পর্যায় থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া।

    এগার. কৃষকদেরকে কৃষি উৎপাদনে উৎসাহিত করার ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তাদের উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে নিশ্চয়তা প্রদান করা। কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য অনলাইন পোর্টাল ব্যবহারে সরকারী-বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করা।

    বার. খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। জাতিসংঘের এজেন্ডা অনুযায়ী টেকসই উন্নয়নের উচ্চমাত্রায় পৌছাতে হলে বাংলাদেশকে নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মত খাদ্য উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে জেলা বা বিভাগ ভিত্তিক সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে খাদ্যের পুষ্টিমানসহ ভেজালের উপস্থিতি পরীক্ষা করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ‍ও সরবরাহের নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য বিশেষায়িত ল্যাবরেটরী স্থাপন করা।

    তের. বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে জৈবসার, জৈব বালাইনাশক ও বিভিন্ন ট্র্যাপিং ফাঁদের উপর থেকে আমদানী শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা।

    চৌদ্দ. দেশের বিভিন্ন এলাকায় কৃষি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করে উৎপাদিত ফসলের উপর ভিত্তি করে কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে তোলা।

    পনের. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে সফলভাবে অভিযোজনের লক্ষ্যে কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের কর্মব্যাপ্তি আরো সম্প্রসারিত করা

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ৯:০১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১

    seradesh.com |

    advertisement
    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০ 
    advertisement

    সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : সাদেকুল ইসলাম | সম্পাদক : আবু সাঈদ

    ঢাকা অফিসঃ বাড়ি #৫ (১ম তলা) রোড #০ কল্যাণপুর, ঢাকা-১২০৭, অফিস ঢাকা রোড সান্তাহার ৫৮৯১
    ফোন : 01767 938324 (মফস্বল) 01830 359796 (সম্পাদক) | E-mail : seradeshmoff@gmail.com, news@seradesh.com

    ©- 2021 seradesh.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

    %d bloggers like this: