• শুক্রবার ৭ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২৪শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম


    ঘুরে আসুন শালবনে ঘেরা আলতাদীঘি

    অরিন্দম মাহমুদ, ধামইরহাট (নওগাঁ) প্রতিনিধি | ২৮ অক্টোবর ২০২০ | ৩:৩৬ অপরাহ্ণ

    ঘুরে আসুন শালবনে ঘেরা আলতাদীঘি

    ধামইরহাটের উপজেলা সদর থেকে ভ্যান অথবা ইজিবাইকে করে উত্তরে মাত্র ৫ কি.মি. দুরেই আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যানকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির গর্ভে গড়ে উঠেছে সু-বিশাল শালবন। সু-বিস্তৃত দীঘির উত্তর পাড়েই তারকাঁটায় ঘেরা ভারতের সীমান্ত ফাঁড়ি। বনের ভেতরে আঁকাবাঁকা পথের ধারেই কারুকার্যখচিত উই পোঁকার ঢিবি, যেনো স্বর্গীয় দেবদূত এসে নিজ হাতে বানিয়েছে। আর বাহারী জংলী গাছের লতা পাতায় মোড়ানো প্রকৃতির আর্শ্বিাদে দ্বারিয়ে আছে অগুনিত শাল গাছ। একটু এগিয়ে যেতেই মেঘেরা হাড়িয়ে যায় অগুনিত শালগাছের আড়ালে, যেনো হঠাৎ করে নেমে আসে অন্ধকার আর তখোনি শিউরে ওঠে গায়ের লোম। দূরথেকে চোখে পরে জংলী ফুল, অচেনা ফুলের ঘ্রাণে জেগেওঠে প্রেম। নাম না জানা অচেনা পাখি আর কোকিলের ডাকে নিমিষেই যেন নেমে আসে বসন্ত। গহীন অরণ্যের আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথের ধারে নেমে আসে সন্ধা। যেতে যেতে খানিকটা পথ এগোতেই শালপাতার মড়মড় শব্দে মনে পরে ছোটবেলায় দাদা দাদীর ঘুম পাড়ানির গল্পের বাঘ মামার কথা, একবার ভেবে দেখুন তখন আপনার বুকের ভেতরে কি হতে পারে, বলছিলাম শালবনে ঘেরা প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের কথা।


    কথিত আছে, আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজত্ব করতেন রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল। তখন রাজার রাজত্বকালেই একবার প্রজাসাধারণের খাবার পানির প্রকট সংকট দেখা দেয়। মাঠ ঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানো হয়ে ওঠে অসম্ভব। হঠাৎ একদিন রানী স্বপ্নের মাঝে দেখলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেই সেই দীঘি পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, তাতেই পানির প্রকট অভাব থেকে মুক্তি পাবে প্রজাসাধারণ।


    সকালে ঘুমথেকে উঠে রাণী রাজার কাছে তার স্বপ্ন অনুযায়ী একটি দীঘি খননের দাবী জানালে রাজা চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন। একদিন প্রেম পুজারী রাজা রাণীর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হলেন এবং একটি দীঘি খনন করে দিতে রাণীকে আসস্থ করলেন। প্রজাদের দুঃখ দুর্দশা দূর করবার জন্য রানী স্বপ্ন অনুযায়ী হাঁটার সিদ্ধান্ত নিলেন। সঙ্গে ছিল রাণীর পাইক পেয়াদা, লোক লস্কর। একদিন রাণী হাঁটতে শুরু করলেন,  হাঁটছেন তো হাঁটছেন বহুদুর হাঁটার পরও রানী থামছিলেননা। এভাবে রাণী হাঁটতে থাকলে পায়ে কষ্ট পাবেন ভেবে রাজা রাণীকে দাঁড়াতে বলেন। রাণী কথা না শুনেই প্রজাদের পানির কথাভেবে হাঁটতেই থাকেন। রাণীর কষ্টের কথা ভেবে রাজা মন্ত্রী এবং উপস্থিত পাইক-পেয়াদাদের নিয়ে রাণীকে আটকানোর কৌশল বের করলেন। পাইক-পেয়াদারা রাজাকে বলেন রাণীমার পায়ে আলতা না ঢেলে দিলে তিনি কখনোই থামবেন না তখন রাজার হুকুমে তাদের একজন মন্ত্রী রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দিলেন আর চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘রানী মা, আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। একথা শুনে রানী তাঁর পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখেন সত্যিইতো পা থেকে রক্ত ঝড়ছে, আলতাকে রক্ত ভেবে রাণী সেখানে বসে পড়েন, প্রেম পুঁজারী রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল ওই স্থান পর্যন্ত একটি দিঘী খনন করে দিলেন। এরপর অলৌকিক ভাবে মুহুর্তেই বিশুদ্ধ পানিতে ভরে ওঠে দিঘী। লোক মুখে কথীত আছে রানীর পায়ে আলতা ঢেলে দেয়ায় সেই থেকে রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল দিঘীটি আলতাদীঘি নামে নামকরণ করেন।


    প্রায় ২৬৪.১২ হেক্টর এই বনভূমির ঠিক মাঝখানে রয়েছে ৪৩ একর আয়তনের বিশাল একঠি দিঘী। দিঘীর সচ্ছ পানিতে ফুটে থাকা হাজারো পদ্মফুল যে কোন ভ্রমণ পিপাসু মানুষকে বিমোহিত করবে। প্রতি বছর শীত যখন জেঁকে বসে, তখন ভারত সীমান্ত ঘেষা এই দিঘীতে বিভিন্ন প্রজাতির নাম না জানা অতিথি পাখি এসে দিঘীর নির্মল পানিতে দাপিয়ে বেড়ায়। ডাহুক, পানকৌড়ির কলকাকলি আর তাদের চঞ্চল ওড়াউড়িতে প্রাণ প্রাচুর্যে মুগ্ধ হয় যেকোন বয়সের মানুষের হৃদয়।


    কেউ কেউ বলেন, প্রাচীন দীঘিগুলির মধ্যে এটিই বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সচল দিঘী। উলেখ্য বিশাল দিঘী রামসাগরের দৈঘর্য এটির চেয়ে ১৫০ মিটার বেশি হলেও চওড়ায় ১৫০ মিটার কম। আর রামসাগর ১৭৫০ সালের দিকে খনন করা হয কিন্তু আলতাদিঘী বৌদ্ধ যুগের দিঘী। আলতাদীঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আলতাদীঘি জাতীয উদ্যান। শালবণ এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪.১২ হেক্টর জমির এই বনভূমিটি ২০১১ সালের ২৪ ডিসেম্বর প্রশাসনের নজরে আসে সাথে সাথে প্রাচীন ঐতিহ্যগত ইতিহাস পর্যালোচনায় এর গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে ওঠে, আর একারণেই আলতাদীঘিকে ২০১১ সালে জাতীয় উদ্দান ঘোষনা করাহয়। নওগাঁ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার, জয়পুরহাট শহর থেকে মাত্র ১৯ কিঃমি। ঢাকা থেকে যেকোনো যানবাহনে খুব সহজেই এই দিঘীতে পৌছানো যায়।


    দিঘীর পাড় ঘেষে বেড়ে ওঠা সু-বিশাল শালবনে সারি সারি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বানর ছানার গাছে গাছে লাফানো আর জানা অজানা হাজারো পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। বনের ভেতর দিয়ে পিচঢালা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলেছে গন্তব্যে। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি শাল গাছ। শুকনো শাল পাতার ফাঁকে বেড়ে ওঠা উইপোঁকার বড় বড় ঢিবি যা সত্যিই বিষ্ময়কর। রাতের আঁধারকে আলোকিত করে যখন চাঁদের রুপালী আলো দিঘীর শান্ত পানিতে পরে তখন সেই আলোয় ছোট বড় মাছেরা খেলায় মেতে ওঠে। অপরদিকে শেয়াল, বেজি আর বনবিড়ালের আনাগোনায় নতুন রুপে আবিষ্কার হয় রাতের আলতাদিঘী ।


    আলতাদিঘী আমাদের দেশের একটি অন্যতম পর্যটন এলাকা হতে পারে, তাই এর পরিবেশ সুন্দর রাখা আমাদের সবার দ্বায়ীত্ব। বন বিভাগ ও একটি বেসরকারি সংস্থা-এনজিও দীঘি ও শালবনের জীববৈচিত্র রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। ফলে বনাঞ্চলের বনভূমি নতুন করে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। বনাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে পাহারাদার বসানো হয়েছে। বনের মূল্যবান গাছপালা চুরি প্রতিরোধের জন্য বন থেকে শালপাতা সংগ্রহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটি এখন গহীন বনভূমিতে পরিণত হয়েছে। এ বনাঞ্চল এমনিতেই সৌন্দর্যময় এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে প্রকৃতির আর্শ্বিাদ। বনের মাঝে রয়েছে ঐতিহাসিক আলতাদীঘি যার দৈর্ঘ প্রায় এক কিলোমিটার। দীঘির পূর্ব-পশ্চিম এবং দক্ষীণে গহীন শালবন। আলতাদীঘির উত্তর ধারের বেশ কিছু অংশ ভারতে পড়েছে। এর ফলে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের কাঁটাতারের বেড়া ও দু’দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার দেখার সৌভাগ্য হবে।

    বনবিট কর্মকর্তা আ. মান্নান বলেন, জাতীয় উদ্যান ঘোষণার পর ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে শালবন বনাঞ্চল ও আলতাদীঘি পর্যন্ত পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বাস, মাইক্রোবাস, ভটভটি ও রিক্সা-ভ্যান যোগে ধামইরহাট থেকে আলতাদীঘি পর্যন্ত চার-পাঁচ কিলোমিটার পথ অনায়াসে পাড়ি জমানো সম্ভব। প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা শাল বাগানে বন বিভাগের উদ্যোগে ইতোমধ্যে ঔষধিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা, বাঁশ ও বেত লাগিয়ে বন্যপ্রাণী ও পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এ বনাঞ্চলে অজগর, হুনুমান, বানর, গন্ধগোকুল, বেজি, সজারু, মেছোবাঘ, বনবিড়াল, শিয়ালসহ প্রায় ২০ প্রজাতির পাখি অবমুক্ত করা হয়েছে। এক দিকে পর্যটক ও দর্শকদের আনন্দ ও বিনোদন যেমন বেড়েছে তেমনি এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজার রাখার জন্য এ বনাঞ্চল যথেষ্ট অবদান রাখছে। বর্তমানে দূর-দুরান্ত থেকে বিভিন্ন যানবাহন যোগে এ জাতীয় উদ্যান দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ। বিশেষ করে ঈদের পর দিন থেকে বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে আসছে দীঘির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

    সুধীমহল মনে করেন, প্রাচীন ঐতিহ্যে ভরপুর শালবনে ঘেরা আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যানের সঠিক ইতিহাস তুলেধরা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

     

     

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৬ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০

    seradesh.com |

    advertisement

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    বাবা ছেলের টান

    ১৮ জুন ২০২০

    advertisement
    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
    ১০১১১২১৩১৪
    ১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
    ২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
    ২৯৩০৩১ 
    advertisement

    সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : সাদেকুল ইসলাম | সম্পাদক : আবু সাঈদ

    ঢাকা অফিসঃ বাড়ি #৫ (১ম তলা) রোড #০ কল্যাণপুর, ঢাকা-১২০৭, অফিস ঢাকা রোড সান্তাহার ৫৮৯১
    ফোন : 01767 938324 (মফস্বল) 01830 359796 (সম্পাদক) | E-mail : seradeshmoff@gmail.com, news@seradesh.com

    ©- 2021 seradesh.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

    %d bloggers like this: