• শনিবার ১৯শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ৫ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম


    সুই-সুতার ফোঁড়ে স্বাবলম্বী শত শত পরিবার  

    অনলাইন ডেস্ক | ০২ মে ২০২১ | ২:৩৮ অপরাহ্ণ

    সুই-সুতার ফোঁড়ে স্বাবলম্বী শত শত পরিবার  

    কেউ সেলাই করছেন, কেউ বা ফুল তুলছেন আবার কেউ বা সুই-সুতা দিয়ে নিখুঁতভাবে পাথর লাগাচ্ছেন, আবার কেউ মালামাল বিক্রি করছেন। যে যার মতো করে কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কারো যেন তাকানোর সময় নেই। এমন দৃশ্য দেখা যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নুরপুর লামার বাড়ি গ্রামে। 

    এই গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট একটি কারখানা। এই কারখানায় টুপি লেহেঙ্গা ও শাড়ির উপর পাথর চুমকি আর নানা প্রকার নকশা তৈরির কাজ করে প্রায় শতাধিক পরিবার বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে।


    গৃহিণীরা সাংসারিক কাজ-কর্ম ও কলেজের ছাত্রীরা লেখা-পড়ার ফাঁকে অলস সময়কে কাজে লাগিয়ে নিপুন হাতে সুই-সুতা দিয়ে উন্নত মানের টুপি ,শাড়ি, লেহেঙ্গার তৈরির কাজ করছেন। টুপি, শাড়ি ও লেহেঙ্গার মান ভালো হওয়ায় এরই মধ্যে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।

    এদিকে ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে ততই টুপি ও শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নারী ও পুরুষরা। চুক্তিতে নেয়া ওই সব টুপি, শাড়ি আর লেহেঙ্গা তৈরি  হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নির্ধারিত শ্রমের মূল্য দিয়ে দিচ্ছেন কারখানার মালিক। টুপি ,শাড়ি আর লেহেঙ্গায় কাজ করে এক একজন শ্রমিক মাসে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। পাশাপাশি এখানে তৈরি হচ্ছে নামাজের মসলা, তাজবীহ। চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্থানে ওইসব মালামাল বিক্রি করা হচ্ছে। টুপি, শাড়ি, লেহেঙ্গা তৈরির কাজ করে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামীণ নারীরাও স্বাবলম্বী হয়েছেন।


    খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আজ থেকে ৭ বছর আগে উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের নুরপুর লামার বাড়ি হেবজু মিয়ার বাড়িতে ভাড়ায় মো. শাহেদ আলী মুন্সি নামে এক উদ্যোক্তা বধূবরণ শাড়ি বিচিত্রা অ্যান্ড আলবাছির ক্যাফ প্রোডাক্ট নামে একটি কারখানা গড়ে তুলেন। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের মো. আব্দুল বাছির মুন্সির ছেলে। এই কারখানাতে তিনি পাথর চুমকি দিয়ে নানা প্রকার নকশা তৈরি করে লেহেঙ্গা, শাড়ি ও টুপি তৈরি করছেন। অতি স্বল্প সময়ে  এই গ্রামটি টুপি ও শাড়ি তৈরির গ্রাম হিসেবে বেশ পরিচিতি লাভ করে।


    কারখানার মালিক মো. শাহেদ আলী মুন্সি বলেন, নানা কারণে লেখা পড়া বেশি দূর এগোতে পারিনি। আমার গ্রামের সমবয়সী বেশিরভাগ লোকজন ব্যবসা, চাকরি করছে। আবার অনেকে বিদেশ ও চলে গেছেন। কিন্তু ছোট বেলা থেকেই আমার একটা ইচ্ছা বিদেশ না গিয়ে দেশের মাটিতে কোনো কিছু করার। পাশাপাশি সুই সুতার কাজে কিছু একটা করার প্রতিনিয়ত স্বপ্ন ও দেখতাম। সেই অনুযায়ী টুপি ও শাড়িতে কাজ শিখতে আমি ঢাকায় চলে যাই। সেখান  থেকে এই কাজ শিখে আমি বাড়িতে চলে আসি। এক পর্যায়ে  নিজে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।

    পরিবার থেকে পাওয় টাকা দিয়ে আখাউড়ার লামার বাড়িতে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রথমে টুপির কারখানা গড়ে তুলি। ওই কারখানা গড়ে তুলতে মোটরচালিত সেলাই মেশিন সুই সুতা, পাথর, পুথি, কাপড়সহ অন্যান্য খরচ হয় প্রায় ৮ লাখ টাকা।

    ওই বছর শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য খরচ বাদে প্রথম বছর আমি এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করি। এভাবে শুরু হয় আমার ব্যবসা। বর্তমানে আমার কারখানাতে মোটরচালিত ২০টি সেলাই মেশিন রয়েছে।  ওইসব মেশিন দিয়ে চলে টুপি সেলাই ও এম্ব্রয়ডারির কাজ। খবর পেয়ে গ্রামের নারীরা হাতের তৈরির কাজ করতে  ছুটে আসছেন কারখানাতে। তাদেরকে রীতিমতো দেয়া হয় প্রশিক্ষণও। এ গ্রামের শাড়ি টুপি তৈরির কাজটি বর্তমান আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে।

    এক অনুসন্ধানে জানা যায়, নুরপুর লামার বাড়ি, হিরাপুর, আব্দুল্লাহপুরসহ আশপাশের  বেশ কয়েকটি গ্রামে প্রায় ৮০ জন নারী ও ১৫ জন পুরুষ শ্রমিক এ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। তারা নিপুনভাবে পাথর চুমকি দিয়ে আকর্ষণীয় কারুকার্যে ফুটে তোলা লেহেঙ্গা, টুপি আর শাড়ি তৈরি করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এ কাজে বেশিরভাগ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অভাবী পরিবারের মেয়েরা পড়া-লেখার পাশাপাশি এ কাজে নিজেকে জড়িয়ে পড়া-লেখার খরচ জোগাচ্ছে।

    শাহেদ আলী মুন্সি বলেন দিনে দিনে ওইসব শাড়ি, লেহেঙ্গা ও টুপির প্রচুর চাহিদা বাড়ছে। প্রতি মাসে শ্রমিকের মজুরি ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, মালামাল ক্রয়সহ অন্যান্য খরচ বাদে প্রতি মাসে ৭০-৮০ হাজার টাকা তার আয় হয়। যা বছরে আয় হচ্ছে ৮ লাখ টাকার উপর।

    তিনি আরো বলেন, শুধু এই ঈদকে কেন্দ্র করে অন্তত ১০ লাখ টাকার টুপির সরবরাহ করা হতো। কিন্তু লকডাউন থাকায় আমাদের অনেক ক্ষতি হয়। এখানকার টুপি লেহেঙ্গা আর শাড়ি এ উপজেলা ছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, ঢাকা, চট্রগ্রাম ও সিলেটে যাচ্ছে।

    জেয়াসমিন আক্তার বলেন, আমার অভাব অনটনের সংসার। স্বামীর আয়ে সংসার চলতে খুবই কষ্ট হয়। তাই আমি এখানে লেহেঙ্গার কারচুপি ও পাথর বসানোর কাজ করছি।

    তিনি আরো বলেন লেহেঙ্গা তৈরি করতে বেশ কয়েক দিন সময় লাগে। নকশার প্রকার ভেদে কাজ করে প্রতি মাসে ৭-৮ হাজার টাকা আয় করছি। এখন আর কোনো সমস্যা হয় না। এই কারখানা আমাদের যেন একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছে।

    কলেজ শিক্ষার্থী লিজা আক্তার, হবিবা আক্তার ও শুভা আক্তার জানান, তাদের পরিবারে অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। কোনো রকমে খেয়ে বেঁচে আছেন। লেখাপড়ার খরচ চালাতে খুবই কষ্ট হয়। তাই পরিবারকে সামান্য সহযোগিতা করতে এখানে টুপি তৈরির কাজ করে লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন। কাজ করে প্রতিমাসে ৪-৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। এতে নিজেদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে বাবা-মায়ের সংসার খরচে সহযোগিতা হচ্ছে ।

    শ্রমিক জুয়েল বলেন, তিনি এই কারখানায় ৩ বছর ধরে এম্ব্রয়ডারির কাজ করছি। কাজ করে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকার উপর আয় করছি।

    তিনি বলেন, প্রতিটি কারিগরের একটা টার্গেট থাকে। আমরা ওই টার্গেট অনুযায়ী কাজ করি। কোনো কোনো সময় ওই টার্গেট ছাড়িয়ে যায়।

    একাধিক নারীরা জানান, তারা কাজের ফাঁকে ফাঁকে প্রতি মাসে টুপি ও লেহেঙ্গায় কাজ করছেন। প্রতি মাসে কাজ করে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন। এখানে যে যত বেশি কাজ করছেন তার আয় ও তত বেশি বাড়ছে।

    এই গ্রামের বাসিন্দা  ও পল্লী চিকিৎসক  মো. শাহজাহান  বলেন, সত্যিই এই কারখানা গড়ে উঠায় এলাকার অসহায় মানুষদের একটা কাজের ঠিকানা হয়েছে । মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। তারা কাজ করে সংসারে অভাব অনটন দূর করছেন।

    Facebook Comments Box

    বাংলাদেশ সময়: ২:৩৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০২ মে ২০২১

    seradesh.com |

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    advertisement
    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১
    ১২১৩১৪১৫১৬১৭১৮
    ১৯২০২১২২২৩২৪২৫
    ২৬২৭২৮২৯৩০ 
    advertisement

    সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : সাদেকুল ইসলাম | সম্পাদক : আবু সাঈদ

    ঢাকা অফিসঃ বাড়ি #৫ (১ম তলা) রোড #০ কল্যাণপুর, ঢাকা-১২০৭, অফিস ঢাকা রোড সান্তাহার ৫৮৯১
    ফোন : 01767 938324 (মফস্বল) 01830 359796 (সম্পাদক) | E-mail : seradeshmoff@gmail.com, news@seradesh.com

    ©- 2021 seradesh.com কর্তৃক সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত।

    %d bloggers like this: