ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পরও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ার একটি কলেজের ভর্তি ফরমে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের রাজনৈতিক প্রতীক ও স্লোগানের ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। চান্দলা করিম বক্স হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ভর্তি ফরমে ‘মুজিব শতবর্ষ’ লোগো এবং ‘শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশ, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ’ স্লোগান ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ফরমে শেখ হাসিনার ছবিও থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এ ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান সময়ে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি ফরমে কীভাবে এমন রাজনৈতিক প্রতীক ও স্লোগান স্থান পেল?
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে ওই ফরমে একাদশ শ্রেণির ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা যায়, ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া ফরমে ‘মুজিব শতবর্ষ’ লোগো ও শেখ হাসিনার স্লোগান মুদ্রিত রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেসব ফরম পূরণ করে সংশ্লিষ্টদের কাছে জমাও দিচ্ছেন। সরবরাহ করা ফরম ও শিক্ষার্থীদের পূরণ করা ফরমের মধ্যে একই ধরনের লোগো ও স্লোগানের উপস্থিতি দেখা যায়।
বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয়দের মধ্যে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি নিছক ছাপার ভুল, নাকি পরিকল্পিতভাবে পুরোনো রাজনৈতিক প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে—তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কলেজ শাখার ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ পরস্পরের ওপর দায় চাপিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ভর্তি কার্যক্রম নিয়ে কোনো সভা না করেই কলেজ শাখার ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ তাঁকে না জানিয়ে একক সিদ্ধান্তে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ফরমে কী ছাপা হয়েছে, তা তিনি জানতেন না। বিষয়টি নিয়ে কমিটির সভাপতির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে কলেজ শাখার ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদ বলেন, ভর্তি-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত তিনি এককভাবে নেননি। রেজুলেশনের মাধ্যমে গঠিত ভর্তি কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ফরমে থাকা লোগো ও স্লোগান কম্পিউটার অপারেটরের ভুলে হয়ে থাকতে পারে।
এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা বলেন, ভর্তি ফরমে ‘মুজিব শতবর্ষ’ ও শেখ হাসিনার স্লোগান ব্যবহারের মতো ঘটনা কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
চান্দলা করিম বক্স হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি আবুল বাশার সরকার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের এত আন্দোলনের পর এমন ঘটনা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কলেজ শাখার ইনচার্জ আবুল কালাম আজাদকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে যারা দোষী প্রমাণিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যক্ষকে অবহিত না করে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। এ ঘটনায় দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শহীদুল করিম বলেন,ভর্তি ফরমে বিতর্কিত লোগো ও রাজনৈতিক উক্তি ব্যবহারের বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সুকোজ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় এখন স্থানীয়দের একটাই প্রশ্ন—ভর্তি ফরমে কীভাবে এমন রাজনৈতিক প্রতীক ও স্লোগান স্থান পেল, এর নেপথ্যে কারা ছিলেন এবং এটি নিছক ভুল নাকি এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল? তদন্তেই বেরিয়ে আসবে প্রকৃত রহস্য।