ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
সেরাদেশ

ক্ষেতলালে প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি,নিয়োগে ১০ লাখ টাকা লেনদেন

জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসায় নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগকে ঘিরে জাল সনদ, প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি, বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং সংরক্ষিত অডিও-ভিডিও মিলিয়ে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, নিয়োগপ্রাপ্ত মিজানুর রহমান ২০১১ সালে কালাই উপজেলার হারুঞ্জা দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেই সনদেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রমাণিত হওয়ার কথা। কিন্তু চাকরির আবেদনপত্রের সঙ্গে বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে ২০০৮ সালের একটি অষ্টম শ্রেণির সনদও সংযুক্ত করা হয়, যা নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক।বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের বলেন, মিজানুর রহমান কখনোই তাঁর বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। তিনি দাবি করেন, কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম সনদটি রেজিস্ট্রেশনের জন্য তাঁর কাছে নিয়ে গেলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, ওই নামে বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। তাঁর ভাষ্য, পরবর্তীতে তাঁর স্বাক্ষর এবং বিদ্যালয়ের প্যাড জাল করে কম্পিউটারে ভুয়া সনদ তৈরি করা হয়েছে।অনুসন্ধানের সময় মিজানুর রহমানও অষ্টম শ্রেণির ওই সনদ সংগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি অকপটে স্বীকার করেন, চাকরি পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ওই সনদ ব্যবহার করেছেন এবং ‘মেহেদী স্যার’ নামে এক শিক্ষকের কাছ থেকে সেটি সংগ্রহ করেছেন।স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে একজন প্রার্থী ইতোমধ্যেই দাখিল পাসের মূল সনদধারী, সেখানে আবার অষ্টম শ্রেণির একটি পৃথক সনদ কেন প্রয়োজন হলো? আর যদি সেই সনদ সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ই অস্বীকার করে, তবে সেটি ব্যবহার করে কীভাবে সরকারি নীতিমালার আওতায় নিয়োগ সম্পন্ন হলো—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো অর্থ লেনদেন। মিজানুর রহমান নিজেই দাবি করেন, নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগের জন্য তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতিকে ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলামকে চার শতক জমি লিখে দিয়েছেন বলেও জানান। এসব কথোপকথনের অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, কৃষ্ণনগর দাখিল মাদ্রাসার স্বীকৃতির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নীতিমালা অনুযায়ী, স্বীকৃতি নবায়ন ছাড়া নতুন নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটি তিনবার আবেদন করেও পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি নবায়ন পায়নি।তারপরও অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি গোপন রেখে স্থানীয়ভাবে স্বল্প প্রচারিত দুটি পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরে ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ নিয়োগ বোর্ড গঠন করে শাহনাজ বেগমকে আয়া এবং মিজানুর রহমানকে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তাঁদের যোগদানও সম্পন্ন করা হয়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এই দুই নিয়োগে প্রায় ১৮ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাদ্রাসার সুপার শহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের একাধিক প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তিনি কেবল বলেন, “নিয়োগ সম্পূর্ণ বৈধ। মিজানুর দাখিল ও আলিম পাস করেছে। মাদ্রাসার সনদ দিয়েই আবেদন করেছে এবং বর্তমানে বেতন-ভাতা পাচ্ছে।” তবে বড়তারা উচ্চ বিদ্যালয়ের কথিত অষ্টম শ্রেণির সনদ, প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ কিংবা নিয়োগে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহাগ মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সামনাসামনি কথা বলবেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি।জয়পুরহাটের ভারপ্রাপ্ত জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আজিজুল হাকিম বলেন, “বিষয়টি আগে আমাদের জানা ছিল না। অভিযোগ সত্য হলে তদন্ত করে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ক্ষেতলালে প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জালিয়াতি,নিয়োগে ১০ লাখ টাকা লেনদেন