গাবতলীতে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে প্রতিমা তৈরির কর্মযজ্ঞ
শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বিভিন্ন মন্দিরে শুরু হয়েছে প্রতিমা তৈরির কর্মযজ্ঞ। খড়, বাঁশ ও মাটি দিয়ে দেবী দুর্গাসহ তাঁর সঙ্গীদের প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারিগরদের ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মন্দিরের প্রতিমা তৈরির স্থান।উপজেলার বিভিন্ন মন্দির ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও বাঁশ ও খড় দিয়ে প্রতিমার প্রাথমিক কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, আবার কোথাও কাঠামোর ওপর মাটির প্রলেপ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ধীরে ধীরে মাটির কাঠামোয় ফুটে উঠছে দেবী দুর্গা, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর অবয়ব। উৎসব যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কারিগরদের কর্মব্যস্ততা।মৃৎশিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয় বাঁশ ও খড় দিয়ে শক্ত কাঠামো তৈরির মাধ্যমে। এরপর পর্যায়ক্রমে সেই কাঠামোর ওপর মাটি লাগানো হয়। প্রথমে মোটা মাটির প্রলেপ দেওয়ার পর প্রতিমার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও মুখমণ্ডলের আকৃতি দেওয়া হয়। কয়েক দফায় মাটি লাগানোর পর তা ভালোভাবে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর প্রতিমায় রং করা, চোখ আঁকা, পোশাক পরানো এবং গহনা ও অন্যান্য অলংকার দিয়ে সাজানোর কাজ শুরু হয়।কারিগরদের ভাষ্য, একটি প্রতিমা সম্পূর্ণ করতে সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগে। তবে প্রতিমার আকার, নকশা ও নির্মাণের জটিলতার ওপর সময় কম-বেশি হয়। বড় ও নকশাদার প্রতিমা তৈরিতে আরও বেশি সময় প্রয়োজন হয়।পূজা কমিটির লোকজন জানান, প্রতিমা তৈরির কাজের জন্য আকার ও নকশাভেদে মজুরি নির্ধারণ করা হয়। সাধারণ প্রতিমার ক্ষেত্রে কারিগররা ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেন। বড় ও জটিল নকশার প্রতিমার ক্ষেত্রে মজুরি ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া প্রতিমা তৈরির উপকরণের খরচ আলাদাভাবে বহন করতে হয়।একজন মৃৎশিল্পী জানান, চলতি মৌসুমে গাবতলীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় চুক্তিভিত্তিক ৬ থেকে ৮টি প্রতিমা তৈরির কাজ করছেন তাঁরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট মন্দির কমিটির কাছে বুঝিয়ে দেওয়াই এখন তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। সময়মতো কাজ শেষ করতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা কাজ করতে হচ্ছে।তিনি বলেন, “প্রতিমা তৈরির প্রতিটি ধাপই খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাঠামো একটুল ভুল হলে পরবর্তী ধাপে সমস্যা হয়। তাই খুব যত্ন নিয়ে কাজ করতে হয়। মাটি শুকানো, আকৃতি দেওয়া ও রং করার ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।”মন্দির কমিটির সদস্যরা জানান, আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে দুর্গোৎসব শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বিভিন্ন মন্দিরে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। মন্দির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, আলোকসজ্জা, পূজামণ্ডপ সাজানো এবং নিরাপত্তাসহ নানা বিষয় নিয়ে প্রস্তুতি চলছে।পূজার দিনগুলোতে মন্দির প্রাঙ্গণে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ঢাকের বাদ্য এবং ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হবে বলে জানান আয়োজকেরা। এ উৎসবকে ঘিরে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এরই মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিমা তৈরির শুরু থেকে পূজা শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরগুলোতে উৎসবের আবহ বিরাজ করে। বিশেষ করে প্রতিমা তৈরির দৃশ্য দেখতে অনেকেই মন্দিরে ভিড় করছেন।সরেজমিনে দেখা যায়, কোনো কোনো মন্দিরে প্রতিমার কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে। কোথাও আবার শিল্পীদের নিপুণ হাতে মাটির প্রলেপে ফুটে উঠছে দেবীর মুখমণ্ডল ও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। প্রতিমা তৈরির এই কর্মযজ্ঞ দেখতে শিশু-কিশোরসহ স্থানীয় অনেক মানুষ মন্দিরে আসছেন।দুর্গাপূজার সময় ঘনিয়ে আসায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন গাবতলীর মৃৎশিল্পীরা। তাঁদের দক্ষ হাতে খড়, বাঁশ ও মাটির সাধারণ কাঠামো ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আরাধ্য প্রতিমায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে উৎসবের মূল আয়োজনে অংশ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন কারিগর ও পূজা কমিটির সদস্যরা।