নওগাঁর মান্দায় দলিলের হাতনকশার (দখল পজিশন) চৌহদ্দি ওভাররাইটিং করে এক ব্যবসায়ীর জমি দখলের পাঁয়তারা, ভেকু (এস্কাভেটর) দিয়ে টিনশেড গোডাউন ভাঙচুর এবং মালামাল লুটপাটসহ ইট মাটিচাপার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী চকউমেদ গ্রামের মফিজ উদ্দীনের ছেলে মো. আমিনুল হক বাদী হয়ে স্থানীয় বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তার ভাই সাবেক ইউপি সদস্য মোকলেছার রহমানের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০-৩০ জনকে আসামি করে মান্দা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, দেলুয়াবাড়ী মৌজার ৩১৩ নম্বর খতিয়ানের হিস্যা অনুযায়ী ১৩ আনা ৫ গণ্ডায় ১ একর ৩৪ শতক জমির মূল মালিক ছিলেন রসিক প্রামাণিক ওরফে ইসমাইল। উক্ত খতিয়ানের ৭৫৯ নম্বর দাগের মোট ৫৩ শতক ধানী জমির ষোল আনা অংশের মালিকও ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ১৫৩১৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার বড় ছেলে রইচ উদ্দিন প্রামাণিককে উক্ত ৫৩ শতক জমি হস্তান্তর করেন।পরবর্তীতে রইচ উদ্দিন প্রামাণিক ২০০৮ সালের ১২ মে ৩৮৮১ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার ছোট ভাই লেলিন উদ্দিন প্রামাণিককে এবং ৩৮৮২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে বোন রমিছা বিবিকে জমি হস্তান্তর করেন। ২০১৭ সালে স্থানীয় বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ৪৪৪৬ নম্বর দলিলে সাড়ে ১১ শতক জমি ক্রয় করেন। এরপর ২০২১ সালের ১৯ জুলাই ৫০৪১ নম্বর দলিলমূলে লেলিন উদ্দিন প্রামাণিকের কাছ থেকে ৭৫৯ নম্বর দাগের দক্ষিণাংশে পৌনে ১৩ শতক জমি ক্রয় করেন ভুক্তভোগী আমিনুল হক (যার প্রস্তাবিত খতিয়ান নং ১৪৮৩)। জমিটি ক্রয়ের সময় নিচু ও গর্ত থাকায় আমিনুল হক সেখানে বিপুল টাকা খরচ করে মাটি ভরাট করেন এবং একটি টিনশেড গোডাউন ঘর নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাড়ির ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।অভিযোগ উঠেছে, বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তার ভাই সাবেক ইউপি সদস্য মোকলেছার রহমান প্রতিপক্ষের যোগসাজশে দলিলের হাতনকশার (দখল পজিশন) চৌহদ্দিতে ওভাররাইটিং করে জালিয়াতির মাধ্যমে আমিনুল হকের জমি জবর দখল করার পাঁয়তারা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৯ আগস্ট সকালে আসামিরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। প্রতিপক্ষরা ভেকু (এস্কাভেটর) দিয়ে আমিনুল হকের নির্মিত গোডাউনটি মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ ফোন দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই গোডাউনে থাকা বিপুল পরিমাণ ভাঙাড়ি মালামাল, মূল্যবান সামগ্রী এবং গচ্ছিত ইট মাটি চাপা দিয়ে রাখাসহ সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা।ঘটনার দিন রাতেই মান্দা থানা চত্বরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে নিয়ে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিবাদীরা আইন নিজের হাতে না তোলার লিখিত মুচলেকা দিয়ে এলেও সেখান থেকে ফিরে এসে পুনরায় জমিতে ইট পুঁতে ও স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে দখলের অপচেষ্টা চালায়।পরবর্তীতে জালিয়াতির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে প্রসাদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নথিপত্র এবং বালাম বই যাচাই-বাছাই করে দেখা যায় যে,বিবাদীদের দাবীকৃত দলিলের সঙ্গে রেজিস্ট্রি অফিসের মূল বালাম বইয়ের কোনো মিল নেই। অর্থাৎ মূল দলিলে ওভাররাইটিং ও তথ্য জালিয়াতি করা হয়েছে।তবে বালামের সঙ্গে জাবেদানকলের মিল আছে বলে জানা গেছে।ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আমিনুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। জমি নামজারি ও খাজনা দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করার পরও প্রভাবশালী বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান ও তার ভাই মোকলেছার রহমান জালিয়াতি করে আমার ১২ লক্ষধিক টাকার ক্ষতি করল। জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরও তারা এখনো অধরা। আমি প্রশাসন ও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে আমার ক্ষয়ক্ষতির বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি।”এদিকে ঘটনার পর আজ সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে অভিযুক্তদের কাউকে পাওয়া যায়নি, ফলে এ বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মান্দা থানার ওসি (তদন্ত) আলিফ উদ্দিন বলেন, “এ বিষয়ে ভুক্তভোগীর একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন ও বালাম বইয়ের অসামঞ্জস্যতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।