জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কানমনা–হারাবতী খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নথিতে ১৮০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে খননকাজে একজন শ্রমিককেও দেখা যায়নি। স্থানীয় দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে ছয়টি এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে পুরো কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন উপেক্ষা করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ দেখানো এবং সরকারি অনুমতি ছাড়াই খালের দুই পাড়ের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে কানমনা–হারাবতী খাল পুনঃখননের দায়িত্ব দেওয়া হয় কানমনা–হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেডকে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় হতদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সেচ সুবিধার উন্নয়ন এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসন। তবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সেই লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে অনিয়মই যেন প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
সরকারি নীতিমালায় খননকাজের অন্তত ৫০ শতাংশ স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকের মাধ্যমে সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই বিধান সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভেকু ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ সরকারি নথিপত্রে ১৮০ জন শ্রমিকের তালিকা জমা দিয়ে তাঁদের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি ব্যবস্থাপনা সমিতির কয়েকজন সদস্যরা জানান, ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়া সহজ করতে শ্রমিকদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়।
এলজিইডির তদারকি কর্মকর্তা ও সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর শ্রমিক ব্যবহার না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে ছয়টি ভেকু ব্যবহার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঠিকাদারকে বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে খালের প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য ১ কোটি ১১ লাখ টাকা এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অবশিষ্ট প্রায় ৫ দশমিক ৯ কিলোমিটার অংশের জন্য ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলতি বছরের ১৫ মার্চ শুরু হয়ে ৩১ মে শেষ হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব কাজের বিস্তর অমিল রয়েছে। নকশা অনুযায়ী খালের গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধির কথা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে কেবল ওপরের পলি ও আগাছা পরিস্কার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও শুধু পাড়ের ঘাস কেটে ঢালু (লেভেল) করা হয়েছে এবং খালের তলদেশ প্রয়োজনীয় গভীরতায় খনন করা হয়নি বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দা মোসতাকিম মন্ডল বলেন, প্রকল্পের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। খালের ভেতরের কিছু উঁচু জায়গা থেকে সামান্য মাটি সরানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো খননকাজ হয়নি। বরং টেন্ডার ছাড়াই খালের পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে কেউ প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এলাকার আরেক সচেতন নাগরিক আব্দুল আলিম জানান, কোটি টাকার প্রকল্পের বাস্তব প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভেকু দিয়ে কাজ করিয়ে দরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট করা হয়েছে। অপরিকল্পিত খননের কারণে প্রথম বর্ষাতেই খালের বিভিন্ন অংশে আবার পলি জমতে শুরু করেছে। তাঁর দাবি, পুরো প্রকল্পের কাজ পুনরায় পরিমাপ করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে খালের নিচু অংশে পানি জমে যাওয়ার সুযোগে প্রকৃত খননকাজ না করেই কচুরিপানা ও আগাছা পরিষ্কার করে কাজ শেষ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কৃষকরা প্রত্যাশিত সেচসুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তবে নকশা উপেক্ষা করে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কানমনা–হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করেই কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ভেকু ও শ্রমিক—উভয়ের সমন্বয়ে কাজ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ সঠিক নয়।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, প্রকল্পের কাজ নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। চূড়ান্ত পরিমাপ (পোস্ট ওয়ার্ক মেজারমেন্ট) শেষে কাজের পরিমাণ অনুযায়ী অবশিষ্ট বিল পরিশোধ করা হবে। কোথাও কম কাজ হলে সে অনুযায়ী বিলও সমন্বয় করা হবে। তিনি আরও জানান, শ্রমিকদের তালিকা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে, তাই সেটি উপজেলা কার্যালয়ে সংরক্ষিত নেই।
