কৃষিজমি রক্ষার আইন যেন কাগজেই বন্দি। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় প্রকাশ্যেই চলছে অবৈধ ড্রেজারের দাপট। উপজেলার আট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ড্রেজার বসিয়ে অবাধে কাটা হচ্ছে আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল)। কোথাও পুকুর খনন, কোথাও জমি ভরাট—সবকিছুই চলছে প্রকাশ্য দিবালোকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই তিন ফসলি জমি ধ্বংসের এই কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক স্পটে ড্রেজার চালু রয়েছে। ব্রাহ্মণপাড়া সদর থেকে চান্দলা পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকাতেই অন্তত ১০টি স্থানে প্রকাশ্যে ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি উত্তোলন ও জমি ভরাটের কাজ চলছে। ফলে একদিকে যেমন কৃষিজমির শ্রেণি ও প্রকৃতি পরিবর্তনের অভিযোগ উঠছে, অন্যদিকে উর্বর টপসয়েল হারিয়ে উৎপাদনক্ষমতা কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম যোগদানের পরও অবৈধ ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেসব কাজ কিছুটা আড়ালে চলত, এখন সেগুলোর অনেকটাই প্রকাশ্যে চলে এসেছে। প্রশাসনের নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় ড্রেজার ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
সরকারি সড়কের পাশেই ড্রেজার, পাইপে ভরাট হচ্ছে ফসলি জমি
সরেজমিনে উপজেলার বড়ধুশিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সরকারি সড়কের পাশেই বসানো হয়েছে ড্রেজার। ড্রেজার থেকে পাইপ টেনে নেওয়া হয়েছে পাশের ফসলি জমিতে। ওই পাইপ দিয়ে মাটি ও পানি সরবরাহ করে জমি ভরাটের কাজ চলছিল।
এ সময় জমির মালিক আলম ভূঁইয়া, হান্নান ভূঁইয়া ও মান্নান ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা হলে তারা ড্রেজারের মাধ্যমে জায়গা ভরাটের বিষয়টি স্বীকার করেন। তাদের ভাষ্য, সুযোগ থাকায় তারা ড্রেজার ব্যবহার করে জমি ভরাট করছেন।
কৃষকের ক্ষোভ—‘চোখের সামনে জমি শেষ হয়ে যাচ্ছে’এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমাদের চোখের সামনে বছরের পর বছর ধরে তিন ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় আমরা হতাশ। এখন মনে হচ্ছে, ব্রাহ্মণপাড়ায় অবৈধ ড্রেজার চালানোই যেন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।’’
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কৃষিজমির টপসয়েলই মাটির উর্বরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বিচারে এই মাটি কেটে ফেলা হলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমি ভরাট ও শ্রেণি পরিবর্তনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘আমি একা’—ইউএনও, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস অবৈধ ড্রেজার ও টপসয়েল কাটার অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে তিনি একাই উপজেলার বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদটিও শূন্য রয়েছে। এ কারণে সব এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে তিনি জানান, শিগগিরই ‘টপসয়েল প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে অবৈধভাবে টপসয়েল কাটা ও ড্রেজার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
দ্রুত অভিযান চান কৃষক-সচেতন মহল
কৃষিজমি রক্ষায় শুধু আশ্বাস নয়, মাঠপর্যায়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও সচেতন নাগরিকরা। তাদের অভিযোগ, অবৈধ ড্রেজার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও কঠোর নজরদারি না থাকলে প্রতিদিনই নতুন করে আবাদি জমি ধ্বংস হবে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—কৃষিজমি রক্ষার আইন যদি বাস্তবায়নই না হয়, তাহলে সেই আইন কৃষকের কী কাজে আসবে? দ্রুত অবৈধ ড্রেজার বন্ধ, টপসয়েল কাটা রোধ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ব্রাহ্মণপাড়ার মূল্যবান তিন ফসলি জমি ক্রমেই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুধু কৃষি নয়, ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশও পড়তে পারে বড় ধরনের ঝুঁকিতে।