নাটোর সদর উপজেলার দত্তপাড়া বাজার থেকে গুরুদাসপুর উপজেলায় মহাসড়ক এড়িয়ে যাতায়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প আঞ্চলিক সড়কটি এখন স্থানীয়দের কাছে আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে প্রশস্ত করেছে। কিন্তু সড়কের ওপর থাকা ছয়টি সেতু আগের মতোই সরু থাকায় উন্নয়নের সুফল ম্লান হয়ে গেছে। বরং প্রশস্ত সড়কের মাঝখানে সংকীর্ণ সেতুগুলো এখন প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষ করে মোকরামপুর এলাকার পুরোনো ও জরাজীর্ণ সেতুটি এখন স্থানীয়দের ভাষায় ‘মরণফাঁদ’। প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ইজিবাইক, পিকআপ, বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী লরি এই সেতু পার হয়। কিন্তু প্রশস্ত সড়ক থেকে হঠাৎ সরু সেতুতে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন চালকরা। ফলে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, বাড়ছে প্রাণহানির আশঙ্কা।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, নাটোর জেলার বিভিন্ন গ্রামীণ জনপথে প্রায় ১০০ কিলোমিটার সড়ক ১২ ফুট থেকে ১৮ ফুটে উন্নীত করা হয়েছে। তবে এসব সড়কে থাকা ২০টিরও বেশি সেতু এখনো আগের প্রস্থেই রয়ে গেছে। ফলে সড়ক উন্নয়ন হলেও সেতুগুলো হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশস্ত সড়কে যানবাহনের গতি আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেতুর মুখ সংকীর্ণ হওয়ায় চালকরা হঠাৎ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। বিপরীত দিক থেকে দুটি বড় যানবাহন একসঙ্গে এলে একটিকে থেমে অপেক্ষা করতে হয়। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
জানা যায়, দত্তপাড়া থেকে গুরুদাসপুরমুখী এই সড়কে দিনভর ভারী যানবাহনের চাপ থাকে। শিল্পকারখানায় পণ্য পরিবহনের ট্রাক, কৃষিপণ্যবাহী যানবাহন এবং যাত্রীবাহী ছোট যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করায় সংকীর্ণ সেতুগুলোতে প্রায়ই তৈরি হয় ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।
এই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়ক প্রশস্ত হওয়ার পর যানবাহনের গতি অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেতুগুলো আগের মতোই সরু। ফলে সেতুর কাছে এলেই আতঙ্ক কাজ করে। প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। কয়েকদিন আগে সন্ধ্যার পর একটি মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেতুর রেলিংয়ে ধাক্কা মেরে নিচে পড়ে যায়। বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
আরেক যাত্রী ফজলুল হক বলেন, “প্রশস্ত সড়কের সঙ্গে সরু সেতুর কোনো সামঞ্জস্য নেই। উন্নয়ন যদি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে, তাহলে সেই উন্নয়ন অপূর্ণ থেকে যায়।”
ইজিবাইক চালক নজরুল ইসলাম বলেন, “দত্তপাড়া থেকে গুরুদাসপুর পর্যন্ত এই সড়কটি এখন খুবই ব্যস্ত। বিশেষ করে বাগরুম এলাকায় প্রাণ কোম্পানির কারখানা থাকায় প্রতিদিন শত শত পণ্যবাহী ট্রাক ও লরি চলাচল করে। বড় গাড়ি সেতুতে উঠলেই ছোট যানবাহনগুলোকে অনেক ঝুঁকি নিয়ে পাশ কাটাতে হয়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
মোটরসাইকেল চালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “রাস্তা বড় হয়েছে, কিন্তু সেতু বড় হয়নি। এতে উন্নয়নের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। মানুষের জীবন রক্ষায় দ্রুত সেতুগুলোও প্রশস্ত করা দরকার।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সেতুগুলো সংস্কার বা প্রশস্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্তত সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড, রোড মার্কিং, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রতিফলক (রিফ্লেক্টর) এবং রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলোতে অস্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে নাটোর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “সড়ক প্রশস্ত হলেও সরু সেতুর কারণে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে, বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। ছোট দৈর্ঘ্যের এসব সেতু প্রশস্তকরণের পরিকল্পনা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে প্রস্তাবনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্র প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে সেতুগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।”
তবে প্রকল্পটির কাজ কবে শুরু হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।