দিনমজুর মন্টু মিয়া। বাড়ি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায়। তাকে একটি কিডনির বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। নেপালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কিডনি দেওয়ার পর তিনি দেশে ফিরে এলেও বাকি টাকা আর পাননি। প্রতিশ্রুতি দেওয়া অর্থ না পাওয়ায় তিনি জয়পুরহাট জজ আদালতের দ্বারস্থ হন। তবে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও পাওনা টাকা না পেয়ে অবশেষে নিরূপায় হয়ে আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করে আদালতে মামলার আবেদন করেন।
এর পরপরই সেরাদেশ.কমের প্রতিনিধি এম রাসেল আহমেদ অনুসন্ধানে নামেন, 'অভাব কখনো শুধু মানুষের পকেট নয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও অসহায় করে তোলে। তারই জলন্ত উদাহরণ দিনমজুর মন্টু মিয়া।
ঋণের ভারে ন্যুব্জ হলেও দেখতেন নতুন জীবনের স্বপ্ন। ১০ লাখ টাকার প্রতিশ্রুতি পেয়ে ভাবলেন- তার স্বপ্ন এবার মনে হয় পূরণ হয়। বদলে যাবে তার পৃথিবী। স্বপ্ন পূরণ করতে দিলেন শরীরের একটি মূল্যবান অঙ্গ 'কিডনি'। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিধিবাম। কিডনির দাম মিটেছিল ১০ লাখ টাকা। কিন্তু হাতে পেলেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা। প্রতারণার শিকার হয়ে এখন আদালতের দ্বারস্থ তিনি।'
এদিকে মন্টু মিয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, কিডনি অপসারণের পর থেকে তিনি আগের মতো ভারী কাজ করতে পারেন না। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হওয়ায় পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। তাঁরা এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তি দাবি করেন।
আদালতের নির্দেশে মামলাটি কালাই থানায় এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
দায়েরকৃত মামলায় জানা যায়, সংসারের অভাব-অনটন, এনজিও এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে করা ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন মন্টু মিয়া। সেই দুর্বলতাকেই পুঁজি করে অভিযুক্তরা তাঁকে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব দেন। তাঁকে বলা হয়, ঢাকার এক ধনাঢ্য নারীর জন্য কিডনি প্রয়োজন। বিনিময়ে দেওয়া হবে ১০ লাখ টাকা। দারিদ্র্যের গ্লানি থেকে মুক্তির আশায় তিনি সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে অভিযুক্তরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করে দেন এবং ৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দেন। পরে ভারত হয়ে তাঁকে নেপালের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। কয়েক দিন চিকিৎসার নামে হাসপাতালে রাখার পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। দেশে ফিরে চুক্তি অনুযায়ী বাকি সাড়ে ৯ লাখ টাকা চাইলে অভিযুক্তরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান।
স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিকার পান নি। অবশেষে গত ১৩ জুন জয়পুরহাটের ৫ নম্বর আমলি আদালতে মামলা করেন মন্টু মিয়া। আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে কালাই থানাকে নির্দেশ দেন। পরে থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়।
মামলার আসামিরা হলেন—বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা-খাঁনপাড়া গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা-বহুতি গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন।
জেলা জজ আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট উজ্জ্বল হোসেন বলেন, অসহায় ও দরিদ্র মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে মানবদেহের অঙ্গ নিয়ে অবৈধ বাণিজ্যের অভিযোগ অত্যন্ত ভয়াবহ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
-6a6c6dfabd2db.jpg)